শীত এলেই অনেক মায়ের চিন্তা বেড়ে যায়। সর্দি, কাশি, জ্বর যেন লেগেই থাকে।
ঠান্ডা আবহাওয়া, শুষ্ক বাতাস আর ধুলাবালিতে এই সময়ে শিশুরা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ভালো খবর হলো, কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই বাড়ানো যায়।
দামি সাপ্লিমেন্ট লাগে না। লাগে ঠিক খাবার, ভালো ঘুম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর একটু যত্ন।
- মৌসুমি ফল ও সবজি দিয়ে সুষম খাবার দিন।
- বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করান।
- সকালের রোদে কিছুক্ষণ খেলতে দিন।
- সময়মতো সব টিকা দিন।
- স্তরে স্তরে আরামদায়ক গরম কাপড় পরান, অতিরিক্ত না।
১. মৌসুমি ফল ও সবজি খাওয়ান
শীতকাল হলো তাজা সবজি আর ফলের মৌসুম। এই সুযোগটা কাজে লাগান।
রঙিন ফল ও সবজিতে থাকে ভিটামিন এ, সি আর নানা খনিজ, যা শরীরকে জীবাণুর সাথে লড়তে সাহায্য করে।

শিশুর প্লেটে রাখুন:
- সবজি: গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, পালং শাক, মিষ্টি কুমড়া।
- ফল: কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, আমলকী, বরই।
- প্রোটিন: ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল।
- দুধ ও দই: হাড় মজবুত রাখে, আর দই পেটের জন্য উপকারী।
শিশু সবজি খেতে না চাইলে খিচুড়ি, স্যুপ বা পরোটার ভেতরে মিশিয়ে দিন।
প্লেটটা রঙিন করে সাজান। রঙ দেখলে ছোটরা খেতে বেশি আগ্রহী হয়।
চিপস, কোমল পানীয় আর বেশি চিনির খাবার কমিয়ে দিন। এগুলো পেট ভরায়, কিন্তু পুষ্টি দেয় না।
ছোট্ট শিশুর জন্য মায়ের দুধ
৬ মাস পর্যন্ত শিশুর জন্য শুধু মায়ের দুধই যথেষ্ট। এতে থাকা অ্যান্টিবডি শিশুকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
৬ মাস পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি নরম খাবার শুরু করুন।
মনে রাখবেন, ১ বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু দেবেন না। সর্দি-কাশিতেও না।
২. পর্যাপ্ত পানি ও গরম তরল দিন
শীতে তৃষ্ণা কম লাগে। তাই শিশুরা পানি কম খায়।
কিন্তু শরীরে পানি কম থাকলে গলা আর নাক শুকিয়ে যায়। তখন জীবাণু সহজে বাসা বাঁধে।
- সারাদিন একটু একটু করে কুসুম গরম পানি দিন।
- মুরগি বা সবজির স্যুপ দিন।
- ডালের পানি আর হালকা গরম দুধও ভালো।
প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলে বুঝবেন শিশুর আরও পানি দরকার।
৩. বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
ঘুমের সময় শরীর নিজেকে মেরামত করে আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।
দিনে (দুপুরের ঘুমসহ) মোটামুটি এতটা ঘুম দরকার:
- ১–২ বছর: ১১–১৪ ঘণ্টা
- ৩–৫ বছর: ১০–১৩ ঘণ্টা
- ৬–১২ বছর: ৯–১২ ঘণ্টা
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে পাঠান।
ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল আর টিভি বন্ধ করুন। স্ক্রিনের আলো ঘুম নষ্ট করে।
৪. সকালের রোদে খেলতে দিন
রোদ থেকে শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করে। এটা হাড় আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুটোর জন্যই দরকারি।
শীতের নরম রোদে প্রতিদিন কিছুক্ষণ বাইরে খেলতে দিন। সকাল বা দুপুরের আগের রোদ সবচেয়ে আরামদায়ক।

দৌড়ঝাঁপ, সাইকেল চালানো বা বল খেলা শরীরকে সচল আর সতেজ রাখে।
খুব ঠান্ডা বা কুয়াশাভরা দিনে ঘরের ভেতরেই নাচ, লাফালাফি বা খেলার ব্যবস্থা করুন।
৫. হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন
শীতের বেশিরভাগ সর্দি-কাশির জীবাণু ছড়ায় হাতের মাধ্যমে।
সাবান আর পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া শেখান। এই সময়ে "হ্যাপি বার্থডে" গানটা দুবার গাওয়া যায়।

হাত ধোয়াবেন বিশেষ করে:
- খাওয়ার আগে
- টয়লেট ব্যবহারের পর
- বাইরে থেকে বা স্কুল থেকে ফিরে
- নাক মোছা বা হাঁচি-কাশির পর
হাঁচি বা কাশির সময় কনুই দিয়ে মুখ ঢাকতে শেখান। এতে অন্যরাও সুরক্ষিত থাকে।
৬. সময়মতো সব টিকা দিন
টিকা হলো শিশুকে মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সরকারি ইপিআই (EPI) কর্মসূচির সব টিকা সময়মতো দেওয়া হয়েছে কিনা টিকা কার্ড দেখে মিলিয়ে নিন।
কোনো টিকা বাদ পড়লে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
৬ মাসের বেশি বয়সী শিশুর জন্য প্রতি বছর ফ্লু (ইনফ্লুয়েঞ্জা) টিকার কথাও শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে জিজ্ঞেস করুন।
৭. ঠিকভাবে গরম কাপড় পরান
শীতে শিশুকে গরম রাখা জরুরি। কিন্তু অতিরিক্ত কাপড় পরানোও ঠিক না।
বেশি কাপড়ে শিশু ঘেমে যায়। ঘাম শুকিয়ে গেলে উল্টো ঠান্ডা লাগে।
স্তরে স্তরে কাপড় পরান

- প্রথম স্তর: নরম সুতি গেঞ্জি বা টি-শার্ট, যা ঘাম শুষে নেয়।
- দ্বিতীয় স্তর: সোয়েটশার্ট, সোয়েটার বা ফ্লিসের জামা।
- বাইরে গেলে: জ্যাকেট, টুপি আর মোজা।
ঘরে ঢুকলে বা গরম লাগলে একটা স্তর খুলে দিন। এভাবে সহজেই তাপমাত্রা সামলানো যায়।
সহজ নিয়ম: আপনি যতটা কাপড় পরেছেন, ছোট শিশুকে তার চেয়ে একটা স্তর বেশি পরান।
শিশুর ঘাড় বা পিঠে হাত দিয়ে দেখুন। ঘামে ভেজা হলে বুঝবেন কাপড় বেশি হয়ে গেছে।
ঘুমানোর সময় ছোট শিশুকে ভারী কম্বল বা অনেক স্তরে মুড়িয়ে রাখবেন না। হালকা, আরামদায়ক কাপড়ই যথেষ্ট।
শীতের জন্য আরামদায়ক কাপড়
নরম সোয়েটশার্ট আর প্যান্টের সেট, ছোট থেকে বড় সব বয়সের মাপে। স্তরে স্তরে পরানোর জন্য একদম উপযুক্ত।
উইন্টার কালেকশন দেখুন৮. ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখুন
শীতে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বাতাসে ধুলা আর দূষণ বেড়ে যায়।
দূষিত বাতাস শিশুর শ্বাসনালিতে জ্বালা তৈরি করে, ফলে কাশি আর শ্বাসকষ্ট বাড়ে।
- শিশুর আশেপাশে কেউ যেন ধূমপান না করে।
- বন্ধ ঘরে মশার কয়েল জ্বালাবেন না। মশারি ব্যবহার করুন।
- দিনের রোদের সময় কিছুক্ষণ জানালা খুলে ঘরে আলো-বাতাস ঢুকতে দিন।
- ঘর ঝাড়ু না দিয়ে ভেজা কাপড়ে মুছুন, তাতে ধুলা কম ওড়ে।
- খুব ধুলার দিনে বাইরে গেলে বড় শিশুকে মাস্ক পরান।
৯. শিশুর ত্বক ও নাকের যত্ন নিন
শীতের শুষ্ক বাতাসে শিশুর ত্বক ফেটে যায়, ঠোঁট শুকিয়ে যায়।
ফাটা ত্বক দিয়েও জীবাণু ঢুকতে পারে। তাই ত্বককে নরম রাখুন।
- কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ে গোসল করান।
- গোসলের পরপরই শিশুর উপযোগী ময়েশ্চারাইজার লাগান।
- ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি দিন।
নাক বন্ধ থাকলে শিশু ঠিকমতো খেতে বা ঘুমাতে পারে না।
এক্ষেত্রে নরমাল স্যালাইন নাকের ড্রপ নিরাপদ ও কাজের। ব্যবহারের নিয়ম ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন।
১০. নিজে নিজে ওষুধ দেবেন না
সর্দি-কাশি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার অভ্যাস আছে অনেকের। এটা ঠিক না।
বেশিরভাগ সর্দি-কাশি ভাইরাসের কারণে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না।
উল্টো অপ্রয়োজনে খেলে পরে দরকারের সময় ওষুধ ঠিকমতো কাজ না-ও করতে পারে।
ভিটামিন বা অন্য সাপ্লিমেন্টও ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দেবেন না। সুষম খাবারেই বেশিরভাগ শিশুর পুষ্টির চাহিদা মিটে যায়।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন
শীতে নিউমোনিয়া শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি। নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান:
- শ্বাস খুব দ্রুত নিচ্ছে, বা শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে
- ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর
- জ্বর ৩ দিনের বেশি থাকছে
- শিশু বুকের দুধ বা খাবার খেতে পারছে না
- বারবার বমি বা পাতলা পায়খানা হচ্ছে
- শিশু অস্বাভাবিক ঝিমিয়ে পড়েছে বা জাগানো কঠিন
- ঠোঁট বা মুখ নীলচে দেখাচ্ছে
- খিঁচুনি হচ্ছে
শিশুর অবস্থা নিয়ে মনে কোনো সন্দেহ জাগলেই ডাক্তার দেখান। মায়ের মনের অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিন।
সাধারণ প্রশ্ন
শীতে শিশুকে প্রতিদিন গোসল করানো কি ঠিক?
হ্যাঁ, কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ে গোসল করানো যায়। খুব ঠান্ডার দিনে একদিন পরপর গোসল করিয়ে বাকি দিন ভেজা কাপড়ে শরীর মুছে দিতে পারেন। গোসলের পরপরই শরীর ভালো করে মুছে গরম কাপড় পরান।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কি ভিটামিন সিরাপ দিতে হবে?
বেশিরভাগ শিশুর জন্য সুষম খাবারই যথেষ্ট। শিশু খুব কম খেলে বা ঘন ঘন অসুস্থ হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ঠান্ডা লাগলে কি শিশুকে বাইরে নেওয়া যাবে না?
সাধারণ সর্দিতে ঠিকমতো গরম কাপড় পরিয়ে রোদের সময় অল্প সময় বাইরে নেওয়া যায়। তবে জ্বর বা শ্বাসকষ্ট থাকলে বিশ্রামে রাখুন, আর অন্য শিশুদের থেকে দূরে রাখুন।
শিশুকে কতটুকু গরম কাপড় পরাব?
সাধারণভাবে আপনার চেয়ে একটা স্তর বেশি। ঘাড় বা পিঠ ঘামে ভেজা হলে কাপড় কমিয়ে দিন, আর হাত-পা খুব ঠান্ডা হলে আরেকটা স্তর যোগ করুন।
শেষ কথা
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এক দিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসেই তা গড়ে ওঠে।
ভালো খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, পরিষ্কার হাত, সকালের রোদ আর আরামদায়ক কাপড়।
এই কয়েকটা জিনিস মেনে চললে এই শীতটা আপনার ছোট্ট সোনামণির জন্য হবে আরও সুস্থ আর আনন্দের।
এই লেখাটি সাধারণ সচেতনতার জন্য। এটি ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়। শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে যেকোনো প্রশ্নে শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।
